পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো তিন মসজিদ সম্পর্কে জানেন কি?

0
185

মসজিদ মুসলমানদের বিভিন্ন ধর্মীয় কার্যাবলীর প্রাণকেন্দ্র। এখানে প্রার্থণা করা ছাড়াও শিক্ষা প্রদান, তথ্য বিতর়ণ এবং বিরোধ নিষ্পত্তি করা হয়। আজ আপনাদের পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো তিন মসজিদ সম্পর্কে জানাবো যেগুলোকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মসজিদের তালিকাতেও প্রথমে রাখা হয়।

১. মসজিদে কুবাঃ পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো মসজিদের মধ্যে একটি হলো “মসজিদে কুবা”। মসজিদটি আনুমানিক ৬২২ খিস্টাব্দে নির্মিত হয়। এই মসজিদে রয়েছে ৬ গম্বুজ ও ৪ মিনার। মসজিদে কুবা নামের এই মসজিদটি মদিনাতে অবস্থিত। মক্কা থেকে মদিনা তে হিজরতের সময় মুহাম্মদ (সঃ) এই মসজিদের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। তিনি এই মসজিদে প্রায় ২০ টি রাত যাপন করেন। এই মসজিদে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়লে উমরা হজ্জের সওয়াব পাওয়া যায়।

২. মসজিদে নববীঃ বলা হয়ে থাকে, পৃথিবীর দ্বিতীয় পবিত্রতম স্থান হচ্ছে “মসজিদে নববী”। এই মসজিদটি নির্মাণ করতে ৭ মাস সময় লেগেছিল। ৬২২ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বরের পর থেকে ৬২৩ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত এই মসজিদের নির্মাণ কাল নির্ধারণ করা হয়।। মুহাম্মদ(সা: ) মসজিদটি নির্মাণের জন্য নাজ্জার গোত্রের সাহল ও সোহাইল নামক দু’জন বালকের নিকট থেকে প্রয়োজনীয় জমি ক্রয় করেন।

এর ক্ষুদ্র একটি অংশে তিনি বাসস্থান নির্মাণ করেন এবং বাকী অংশে মদিনা মসজিদের নির্মাণ কাজ শুরু করেন। মদিনা মসজিদের প্রাথমিক আয়তন ছিল ১০০*১০০ হাত বা ৫৬*৫৬ গজ। মসজিদের ভিত্তি ও দেয়ালের নিম্নভাগ ৩ হাত পর্যন্ত প্রস্তর নির্মিত ছিল। প্রথম দিকে মদিনা মসজিদ রৌদ্র-শুষ্ক ইট দ্বারা নির্মিত হয়। বাকী আল-খাবখাবা উপত্যাকা হতে আনিত কাদা দ্বারা তৈরি করা হয়েছিল এই রৌদ্র-শুষ্ক ইট।

তখন মদিনা মসজিদের দেয়াল ছিল ৭ হাত উঁচু। ছাদকে শক্তিশালী ও মজবুত রাখার জন্য মদিনা মসজিদের ৩৬টি খেজুর গাছকে স্তম্ভ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। আর মসজিদের ছাদ নির্মিত হয়েছিল খেজুর পাতা দিয়ে। ছাদকে সুন্দর করার জন্য, রৌদ্র ও বৃষ্টি থেকে রক্ষার জন্য খেজুর পাতার উপর কাঁদামাটির আস্তরণ লেপে দেয়া হয়েছিল।

সে সময় মদিনা মসজিদে প্রবেশের জন্য ৩টি দরজা ছিল। প্রধান প্রবেশ পথ যেটা দক্ষিণ দিকে অবস্থিত সেটা দিয়ে মুসল্লিরা মসজিদে প্রবেশ করতেন ও বের হতেন। পশ্চিম দেয়ালে ছিল মসজিদের দ্বিতীয় প্রবেশ পথদ্বার যা “বাবে রহমত” নামে পরিচিত। তৃতীয় প্রবেশ পথটি ছিল পূর্ব দেয়ালে যা দিয়ে মুহাম্মদ (সা: ) এ মসজিদে প্রবেশ করতেন।

এ জন্য এটির নাম হয় “বাব উন নবী”। ঐতিহাসিক উইনসিংকের মতে, মদিনা মসজিদের দরজা প্রস্তর নির্মিত ছিল। মদিনা মসজিদেই সর্ব প্রথম মেহরাব, মিম্বার, আজান দেয়ার স্থান বা মিনার ও ওজুর স্থান সংযোজন করা হয়। বর্তমানে মদিনা মসজিদে আগের চেয়ে অনেক সম্প্রসারিত।

সম্পূর্ণ নতুন নকশার ভিত্তিতে এটিকে সম্প্রসারণ করা হয়েছে এবং একই সঙ্গে লক্ষ লক্ষ মুসল্লীর নামাযের সুব্যবস্থা করা হয়েছে। মসজিদে নববী বর্তমানে পৃথিবীর বড় মসজিদের মধ্যে একটি। এই মসজিদ কমপ্লেক্সের মধ্যে হজরত মুহাম্মদ (সঃ) এর রওজা মোবারক এবং আবু বকর (রাঃ) ও ওসমান (রাঃ) এর কবর অবস্থিত।

দক্ষিন পশ্চিম কর্নারে সবুজ রঙের গম্বুজ টি যেখানে অবস্থিত সেখানে আয়েশা (রাঃ) এর ঘর ছিল। আয়েশা (রাঃ) এর ঘরেই নবীজীর রওজা মোবারক অবস্থিত। ইসলামের বিধানানুযায়ী লক্ষ লক্ষ মুসলমান জিয়ারত করতে যান মদিনা মসজিদের অভ্যন্তরস্থ মুহাম্মদ (সা: )-এর রওজা শরীফ। হজ্জ সম্পাদনের আগে বা পরে হাজীরা মসজিদে নববীতে একনাগাড়ে কমপক্ষে ৮ দিন অবস্থান করে নাগাড়ে ৪০ রাক্বাত নামায আদায় করেন।

৩. মসজিদে হারামঃ মহান আল্লাহর উদ্দেশ্যে ইবাদত করার জন্য পৃথিবীর প্রথম উপাসনালয় হলো ‘কাবা শরিফ’ যা নির্মাণ করেছিলেন পৃথিবীর প্রথম মানব হজরত আদম (আ.)। এই কাবা ঘরকে ঘিরেই গড়ে ওঠেছে মসজিদ আল-হারাম। পরবর্তী সময়ে ধ্বংস এবং বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিল। খ্রিস্টপূর্ব ২১৩০ সালে হজরত ইব্রাহিম (আ.) কর্তৃক কাবাঘর পুনর্নির্মিত হয় বলে পবিত্র কোরআনে বর্ণিত আছে।

তবে হজরত ইব্রাহিম (আ.) নির্মিত কাবাঘরের অংশ হিসেবে এখন কেবল হজরে আসোয়াদ বা ‘কালো পাথর’-এর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। এ পাথরটি বেহেস্ত থেকে একজন ফেরেস্তা নিকটবর্তী আবু কুইবা পাহাড়ে নিয়ে আসেন। হজরত মোহাম্মদ (সা.) মক্কা বিজয়ের পর কাবাগৃহ পুনর্নির্মাণে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করেন। প্রতিদিন ২০ লাখ মুসল্লির নামাজ আদায় ও আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত মসজিদ আল-হারামকে ২০১০ সালের মুসলমানের ব্যবহার উপযোগী করে তোলা হয়।

বর্তমানে প্রতিদিন ৯ লাখ মুসলমান এখানে নামাজ আদায় করতে পারেন। পবিত্র হজ পালনকালে মসজিদ আল-হারাম এবং এর পার্শ্ববর্তী এলাকায় ৪০ লাখ মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। মসজিদ আল-হারামের মধ্যস্থলে রয়েছে কাবাঘর। এ পবিত্র ঘরটি কালো গ্রানাইড পাথর দিয়ে নির্মিত।

পৃথিবীর সব মানুষ এই কাবাঘরের দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করে। ৬০৫ সালে হজরত মোহাম্মদ (সা.) এ কাবাঘরের কোণায় হজরে আসোয়াদ স্থাপন করেন। এক সময় কিছুটা দূরে থাকলেও বর্তমানে মকাম-ই-ইব্রাহিম, জমজম কূপ এবং সাফা-মারওয়া মসজিদ আল-হারাম চত্বরেই অংশ হয়ে রয়েছে। আয়তন, জনসমাবেশ ব্যবস্থাপনা, স্থাপত্য নিদর্শন সর্বোপরি ধর্মীয় বিবেচনায় মসজিদ আল-হারাম পৃথিবীতে মহান আল্লাহ তায়ালার কুদরতি নিদর্শন।