এয়ারপোর্টে বসে আছি ৩০মিনিট পর ফ্লাইট। মা দৌরে এসে কাদতে কাদতে বললেন বাপরে আব্বা আমার ….

0
32

এয়ারপোর্টে বসে আছি- এয়ারপোর্টে বসে আছি ৩০মিনিট পর ফ্লাইট। ৩০ মিনিট খুব বেশি সময় মনে হচ্ছে। একেকটা মিনিটকে ঘন্টা মনে হচ্ছে। দেশ ছাড়ার আগে দেশীয় মুখ গুলো শেষবারের জন্য দেখে নিচ্ছি। এমন সময় এক হুজুরের দিকে চোখ পড়লো।, যিনি তার বৃদ্বা মায়ের পা ধুইয়ে দিচ্ছে।পাশেই হুজুরের স্ত্রী তার সন্তানকে নিয়ে আরামে বসে আছেন। কিন্তু হুজুরের স্ত্রী থাকা সত্তেও তিনি তার মায়ের পা নিজেই ধুয়ে দিচ্ছেন।

বিমান বন্দরের মতো ভি আই পি জায়গায় পা ধুয়ে দেওয়ার মতো কাজ করতে হুজুর একটুও সংকোচ বোধ করছেন না। কিন্তু আমি আমার মাকে নিজের বাসায় একটুকু সেবা কোনদিন করেছি বলে মনে পরছে না। আমি মিরাজ বেশ কিছু মাস ধরে মা বাবাকে রেখে বউয়ের সাথে শ্বশুর বাড়িতে আছি। আমার বাবা ঠেলাগাড়ি চালায়। আমাকে বিদেশ পাঠানোর মতো আর্থিক অবস্থা উনার নেই।

তাই শ্বশুর বাড়ির কাছ থেকে টাকা নিয়ে জীবিকার জন্য মালয়েশিয়া যাচ্ছি। টাকা দেওয়ার বিনিময়ে শ্বশুরবাড়ির লোকজন অবশ্য শর্ত একটা জুড়ে দিয়েছে। আমাকে ঘর জামাই থাকতে হবে আর মা বাবার খোজ খবর নেওয়া যাবে না।শ্বশুরবাড়ির সকলের কথায় আমিও রাজি হয়ে গেলাম।

গত কয়েক মাস যাবত মা বাবাকে ছেরে শ্বশুরবাড়িতেই আছি। এখন শর্ত অনুযায়ী তাদের দেওয়া টাকা দিয়েই বিদেশ যাচ্ছি।আমাকে টাকা দেওয়ার ব্যাপারে অবশ্য তাদের আগ্রহ খুব একটা ছিলো না। তবুও শেষ পর্যন্ত টাকাটা আমাকে দিয়েছেন।

আজ আমার ফ্লাইট আমার বৃদ্বা পিতা মাতা এটা জানে না। শ্বশুরবাড়ির দেওয়া শর্তের কারনে জানাতেও পারিনি। বউকে শ্বশুরবাড়ি রেখে তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সোজা বিমান বন্দরে ফ্লাইটের জন্য অপেহ্মা করছি। কিন্তু মায়ের প্রতি হুজুরের ভালোবাসা দেখে নিজেকে কেমন জানি দোষী দোষী লাগছে। হুজুর তার মায়ের পা ধুয়ে দিচ্ছেন আর আমি বিদেশ চলে যাচ্ছি কিন্তু আমার মাকে শেষ দেখাটাও দেখে গেলাম না।

হুজুর তার মায়ের সেবা করছে আর আমি আসামীর মতো এক ধ্যানে দেখছি। আর নিজের মায়ের কথা ভাবছি। আমি যে প্রথম থেকেই হুজুরের কার্যকলাপ এমন ভাবে দেখছি। তা হয়তো হুজুর খেয়াল করলেন। আমার পাশে এসে বসলেন আর বললেন।

-মা,বাবা আছেন? -জ্বি আছেন।
-মা,বাবাকে ছেরে বিদেশ যেতে কস্ট হচ্ছে?

-আমি বিদেশ যাচ্ছি আমার বাবা মা জানেন না। আমার কথা শুনে এবার হুজুর বিশ্মিত হয়ে কারন জিজ্ঞেস করলেন।

-কেন তোমার বাবা মা জানেন না? আমি এবার সব ঘটনা হুজুরকে বিস্তারিত বললাম। হুজুর বললেন শ্বশুরবাড়ির টাকা নিয়ে বিদেশ যাচ্ছো বলে মা বাবাকে ভুলে থাকবে? তুমি তাদের একমাত্র সন্তান তুমি ছাড়া তো তাদের আর কেও নেই। আর তুমি যেই শ্বশুরবাড়িতে উঠেছো সেখানে তোমার শ্বশুর, শ্বাশুড়িকে দেখার জন্য তাদের একাধিক সন্তান রয়েছে। শোন পৃথিবীতে পিতা মাতার মতো আপন আর কেও নেই।সন্তানকে মা বাবার মতো কেও আর ভালোবাসতে পারে না।

হুজুরের কথা গুলো কেন জানি, আমার মনকে ছুয়ে গেলো।
হুজুর বললেন তুমি দেখতে চাও কারা তোমায় সত্তিকারের ভালোবাসে? মা বাবা নাকি শ্বশুর শ্বাশুড়ি?
আমি চুপ করে রইলাম। হুজুর আমার কাছে আমার শ্বশুরের নাম্বার চাইলেন,আমি বাধ্য ছেলের মতো নাম্বার দিলাম।
হুজুর এবার আমার শ্বশুরকে কল দিলেন।
কল রিসিভ হওয়ার পর হুজুর বললেন।
-আপনি কি মিরাজের শ্বশুর?
-হ্যা আমি মিরাজের শ্বশুর, আপনি কে?
-আমি বিমান বন্দর থেকে কাস্টম অফিসার বলছি।আপনার জামাইয়ের ভিসা কাগজপত্র সব নকল, ৫০হাজার টাকা নিয়ে এসে আপনার জামাইকে ছাড়িয়ে নিয়ে যান।নয়তো যাবজ্জীবনের জেলও হতে পারে।

আমার শ্বশুর টেলিফোন সংযোগ থাকা অবস্থায় আমাকে ছাড়াতে টাকা লাগবে এমনটা বলায়, আমার বউয়ের বড় ভাই বললো ওর পিছে এমনিতেই অনেক টাকা গেছে বাবা,আর এক টাকাও দিতে পারবো না।
আমার শ্বাশুড়ি বললেন জেল হয়ে যায় যাক। মেয়েকে আরেক জায়গায় বিয়ে দেব। তাও আর টাকা দিতে পারবো না। চালান করে দিতে বলো।
কল লাউড স্পিকারে থাকায় আমি সবই শুনতে পেলাম।
তাদের পারিবারিক আলোচনা শেষ হলে আমার শ্বশুর হুজুরকে বললেন স্যার আমাদের কাছে কোনো টাকা পয়সা নেই।যা করার আপনারাই করেন।

এবার হুজুর আমার কাছ থেকে আমার বাবার নাম্বার নিয়ে কল দিলেন।
কল রিসিভ করতেই হুজুর বললেন।
-আপনি কি মিরাজের বাবা?
-জ্বে আমি মিরাজের আব্বা, আপনে কে?
এবার হুজুর বাবাকেও একই কথা বলে ৫০হাজার টাকার দাবি করলেন।এবার বাবার কন্ঠস্বর ভারি হয়ে এলো।বাবা কান্না বিজড়িত গলায় মাকে বললো।

শুনছো আমাগো মিরাজরে পুলিশ কেন জানি?
আটকায়া রাখছে। ৫০ হাজার টাকা না দিলে নাকি আমাগো মিরাজরে সারাজিবন জেলে ঢুকায়া রাখবো। বাবার কথা শুনে মা মিরাজ মিরাজ বলে চিৎকার করতে শুরু করলো।
হুজুর এবার বললেন টাকা দিতে পারবেন কি না সেটা বলুন?
বাবা বললো স্যার আমি টেহা নিয়া অহ্মন আইতাছি আমার মিরাজরে কিছু কইয়েন না সার।

আমি হুজুরকে বললাম আমার বাবা ঠেলাগাড়ি চালায় ৫ হাজার টাকাও তিনি দিতে পারবেন না। হুজুর বললেন অপেহ্মা করো।আমার ফ্লাইটের আর ১ ঘন্টা বাকি।
বাবা মা যেহেতু এখনো আসেনি।তার মানে টাকার জোগার ও হয়নি আর আসবেও না।আমি বিমানে ওঠার প্রস্তুতি সম্পন্ন করলাম।হঠাৎ বিমান বন্দরের ইনডোরের গেইট থেকে চিৎকারের আওয়াজ পেলাম। সবাই সেখানে ভিড় জমিয়েছে। আমিও এগিয়ে গেলাম।

গিয়ে দেখলাম মা এক পুলিশ কর্মকর্তার পা ধরে কান্না করছে। কেদে কেদে বলছ সার ও সার আমাগো মিরাজ এই ঘরের ভিতরে আছে।মা বাবার পোষাক আষাক দেখে পুলিশ তাদের ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছে না। এক সময় মার কান্নায় বহু মানুষ জড়ো হয়ে গেলো।পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য বিমান বন্দরের ভারপ্রাপ্ত প্রধান কর্মকর্তা চলে এলো।

বাবা মনে করলেন ইনিই বাবাকে কল দিয়েছিলেন। বাবা এবার এই অফিসারের পায়ে পরে গেলেন।পা ধরে সন্তান হারা পাগলের মতো বলতে লাগলেন সার মিরাজের মায়ের গয়না আর আমার ঠেলাগাড়ি বেইচ্চা ৪০ হাজার জোগার করছি। এই টাকা নিয়াই আমাগো মিরাজরে ছাইরা দেন।

বাবার এমন দৃশ্য দেখে আর ঠিক থাকতে পারলাম না।দৌরে গিয়ে বাবার পা ধরে মাফ চাইতে লাগলাম। এখন আর ভি আই পি জায়গায় পিতার পা ধরতে লজ্জা লাগছে না। বাবা আমায় বুকে টেনে নিয়ে বললেন,বাপ এগুলা বলতে নাইরে বাপ।

মা দৌরে এসে কাদতে কাদতে বললেন বাপরে আব্বা আমার তরে কেও মারে নাইতো?
আমি বললাম তোমাদের মতো মা-বাবা যার আছে তাকে কে মারবে