দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হয়েও পৃথিবীতে আলো ছড়িয়েছেন যারা

কবি হোমার

জগতখ্যাত নাম হোমার। ইলিয়াড ও ওডিসি তার বিখ্যাত রচনা। হোমার নামে আদৌ কোনো কবি ছিলেন কি না তা নিয়ে ১৯শ’ শতাব্দীতে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। ২০শ’ শতাব্দীতে এই বিতর্কের অবসান ঘটে এবং তার অস্তিত্ব স্বীকার করে নেয়া হয়।

হেলেন কিলার

অন্ধ ব্যক্তিদের মধ্যে একটি পরিচিত ও সফল নাম হচ্ছে হেলেন কিলার। একজন অন্ধ, বোবা আর বধির মেয়ে কেবল সাধনার কারণে মাত্র চব্বিশ বছর বয়সে সর্বোচ্চ মার্ক নিয়ে বিএ পাস করেন এবং পরবর্তীতে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দের ২৭ জুনে হেলেন কিলার জন্মগ্রহণ করেছিলেন। আর দশটা স্বাভাবিক শিশুর মতোই হেলেন কিলারের জন্ম হয়েছিল। কিন্তু ১৯ মাস বয়সে জ্বরে আক্রান্ত হয়ে তিনি বধির ও দৃষ্টিহীন হয়ে যান। ছয় বছর বয়সে হেলেন কিলার টেলিফোন আবিষ্কারক আলেকজান্ডার গ্রাহামবেলের সহায়তায় বধিরদের জন্য বিশেষ একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান। এখানেই শিক্ষক অ্যান সুলিভানের সহযোগিতায় তার পাঠ গ্রহণের কঠিন অধ্যবসায়ের সূচনা হয়। তিনি শেষ পর্যন্ত রেডক্লিফ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তবে ডিগ্রি অর্জনের আগেই নিজ আত্মজীবনী দ্যা স্টোরি অব মাই লাইফ প্রকাশিত হয়। দ্যা ওয়ার্ল্ড আই লিভ ইন, আউট অব ডার্ক, মাই রিলিজিয়ন তার বিখ্যাত বইগুলোর অন্যতম। ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দের এই দিনে অন্ধ ও বধির এবং বিশ্বখ্যাত লেখিকা হেলেন কিলার ৮৭ বছর বয়সে পরলোকগমন করেন।

ড. তাহা হোসাইন

তিনি এমন একজন অন্ধ পণ্ডিত যিনি দুই বিষয়ে ডক্টরের ডিগ্রির অধিকারী ছিলেন। নিজের প্রতিভার জন্য তিনি মিসরের বিশ্বখ্যাত আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর হতে পেরেছিলেন। তিনি দুইবার মিসরের শিক্ষামন্ত্রী পর্যন্ত হয়েছিলেন। খ্যাতিমান এই মানুষটির নাম তাহা হোসাইন। তিনি ১৮৮৯ সালে মিসরের এক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ডক্টর তাহা হোসাইন একাধারে গবেষক, সমালোচক, ছোট গল্প লেখক এবং ঔপন্যাসিক ছিলেন। তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ১০৪টি! তিনি মাত্র এগারো বছর বয়সে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। আধুনিক আরবি সাহিত্যের এই পণ্ডিত ১৯৭৩ সালে ৮৭ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

মহাকবি রুদাকী

জন্মান্ধ এই কবি নবম শতাব্দীর শেষের দিকে সমরখন্দের রুদাক জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। রুদাকী ছিলেন ফার্সি সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। ফার্সি সাহিত্যে একটি প্রবাদ আছে, ‘সাতজন কবির সাহিত্য কর্ম রেখে যদি বাকি সাহিত্য দুনিয়া থেকে মুছে ফেলা হয়, তবু ফার্সি সাহিত্য টিকে থাকবে। এই সাতজন কবির একজন হচ্ছেন রুদাকী। অপর ছয়জন কবি হলেন ফেরদৌসী, হাফিজ, নিজামী, মাওলানা রুমী, শেখ সাদী এবং কবি জামী। অন্ধ কবি রুদাকীকে স্বভাব কবিও বলা যায়। তিনি গ্রীক কবি হোমারের মতো যে কোনো মজলিশে কিংবা রাস্তায় দাঁড়িয়ে অনর্গল কবিতা আওড়াতে পারতেন। তার স্মরণশক্তি এত বেশি ছিল যে, একবার যা আওড়াতেন পরে তা হুবহু বলে দিতে পারতেন। তিনি যখন কবিতা আবৃত্তি করতেন তখন তার ভক্তরা তা লিখে রাখতেন।

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হয়েও তারা বিশ্ববিখ্যাতবাশার ইবনে বার্ড

কবি বাশার সপ্তম শতাব্দীর শেষ দশকে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ছিলেন একজন ক্রীতদাস। কবি বাশার ছিলেন জন্মান্ধ। তিনি ইরাকের বসরার স্কুলে ভর্তি হবার পর শিক্ষকরা একবার যা বলতেন জীবনে তা কখনো ভুলতেন না। কেবল শোনা এবং মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে তিনি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করেন। তিনি একজন বড়মাপের কবি ছিলন। তার অধিকাংশ কবিতাই ছিল অন্যায়-অবিচার এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে। অন্যায় করলে তিনি খলিফাকেও খাতির করতেন না। একবার খলিফার বিরুদ্ধে কবিতা লেখার অপরাধে আব্বাসীয় খলিফা আল মাহদী তাকে রাজদরবারে ডেকে পাঠালেন। খলিফা কবিকে বললেন, আমার বিরুদ্ধে কবিতা লেখার পরিণতি কী হতে পারে আপনি তা জানেন? খলিফার কথা শুনে কবি বাশশার বললেন, জানি। তবে মনে রাখবেন বাদশাহ নামদার! আল্লাহ আমাকে চোখের জ্যোতি দেননি বটে কিন্তু তিনি আমাকে অন্যায় ও অবিচার ঘৃণা করার ক্ষমতা দিয়েছেন প্রচুর। কবির এ কথা শুনে খলিফা তাকে বন্দি করার আদেশ দেন। কবির বয়স তখন ৯০ বছর। এই বৃদ্ধ বয়সেও তিনি অন্যায়ের কাছে মাথানত করলেন না। বন্দি অবস্থায় ৭৮৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি ইন্তেকাল করেন।

Comments

comments