Sunday , 20 May 2018

কত বাচ্চুর লাশের দাফনও হয়নি, তার হিসাব নাই

২০১১ সালের কথা। তখন সুন্দরবনের সবচেয়ে বড় দস্যু বাহিনীর নাম রাজু বাহিনী। আবার আমার প্রথম দস্যুদের কাছে যাওয়া সেই রাজু বাহিনীর কাছে। ঢাকা থেকে সঙ্গী হয়েছিলেন এটিএন নিউজ এর ভিডিওগ্রাফার সোহেল রানা। আর মংলা থেকে সঙ্গী হন স্থানীয় সাংবাদিক নিজাম উদ্দীন। খুলনা থেকে রওনা দিয়ে রাতভর ট্রলার চালিয়ে আমাদের রাজু বাহিনীর আস্তানায় নিয়ে যান দস্যু সদস্য মাইজ্যা ভাই জাহাঙ্গীর। গড়ইখালীর মজিবরের ট্রলারে প্রথম নির্ঘুম রাত কাটে আমার।







ভোর বেলা রাজু বাহিনীর সঙ্গে দেখা হওয়ার পর থেকেই আমাদের সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রেখেছিল এক কিশোর দস্যু। নাম আরিফ। সবাই ভাগনে আরিফ নামে ডাকতো। আর তার সঙ্গী ছিলো আরেক কিশোর বাচ্চু ওরফে নানা। তারা দু’জনই ছিল রাজুর সবচেয়ে বিশ্বস্ত।







রাজু বাহিনী তখনকার সবচেয়ে দাপুটে দস্যু দল। তার নামেই চাঁদা উঠতো কোটি কোটি টাকা। তিনটি বড় ট্রলারে প্রায় ষাটজনের দস্যু দলের সর্বকণিষ্ঠ সদস্য ছিলো আরিফ ও বাচ্চু।







আমি যেদিন সেখানে যাই, সেদিন প্রায় পুরোটা সময় ছিলাম রাজুর ট্রলারে। অনেক গল্প, খাওয়া শেষে দুপুরে সবাই বিশ্রামে যায়। আমার শোয়ার ব্যবস্থা করা হয় রাজুর ক্যাবিনে। তখন বনের একমাত্র সিএমসি (স্টেনগান) ছিল রাজুর কাছে। সেটিতে তোয়ালে জড়িয়ে মাথায় দিলাম বালিশ হিসেবে। ডানে রাজু আর বামে শোয়া আরেক দস্যু মুকুল। আমার দুই পাশে তাদের অস্ত্র দুটি রাখা। আর পা এর কাছে বসা আরিফ। জীবনের সবচেয়ে অস্বস্তিকর সময় ছিল সেই এক ঘন্টা। তারপর নামলো কালবৈশাখী ঝড়। বিকেলে শ্যুটিং এর কাজ সেরে সন্ধ্যায় আমরা রওনা দিলাম।







যে গল্পটি বলার জন্য এতকিছু বললাম, সেটি শুরু করি এবার। ঘটনাটি ঘটে আমরা সেখান থেকে চলে আসার পর পরই। কালেকশনের প্রায় ৭৫ লাখ টাকা তখন বাহিনী প্রধান রাজুর কাছে। আরিফ আর বাচ্চু সব সময় রাজুর আশে পাশেই থাকতো। কয়েকদিন ধরেই তারা এই টাকা নিয়ে পালানোর পরিকল্পনা করছিল। প্রস্তুতি হিসেবে আগেই ভারত থেকে ঘুমের অষুধ আনিয়েছিল তারা।







ঘটনার দিন বাহিনী প্রধান পরিবার সহ অবস্থান নিয়েছে শিবসা নদীর তীরে আদাচাই ফরেস্ট অফিসে। বাকী দুটি ট্রলার ছিল শিবসার আরেকটু নিচে নিশানখালীতে। রাজুর ট্রলারের সবার রাতের খাবারে ওষুধ মিশিয়ে দেয় নানা ওরফে বাচ্চু। সেই খাবার খেয়ে ঘন্টা দুই এর মধ্যেই সবাই ঘুমিয়ে পড়ে। অনেকে অসুস্থ্য হয়ে পড়ে।







মোটামুটি সবাই যখন অচেতন, তখন টাকার ব্যাগ নিয়ে পালিয়ে যায় আরিফ ও বাচ্চু। সঙ্গে ৭৫ লাখ টাকা। নিরাপত্তার জন্য নেয় সেই এসএমসি বা স্টেনগানটি, একটি একনলা বন্দুক ও একটি নাইন এমএম পিস্তল। আদাচাই এর খালটি বেশ বড় আর খরশ্রোতা। সেই নদী পার হতে গিয়ে হাতছাড়া হয় আরিফের একনলা বন্দুকটি। খালের ওপারে ফেলে যায় স্টেনগান (এসএমসি) টি। সঙ্গে তখন সেই টাকার ব্যাগ আর একটি পিস্তল। উত্তেজনায় একটু পর পর হাঁপিয়ে ওঠে তারা। কিন্তু সারা রাত আর পরের দিন একটানা হেঁটে প্রায় কালাবগীর কাছে পৌঁছে যায় তারা। কতগুলো খাল নদী পার হয়েছিল তারা সে হিসাব এখনও দিতে পারেনি আরিফ।







এদিকে রাতেই আদাচাই ফরেস্ট অফিসের এক কর্মীর নজরে আসে বিষয়টি। রাজুদের বেহুঁশ অবস্থা দেখে ফোন দেয় একটু দূরে থাকা বাকী সদস্যদের। দুটি ট্রলার নিয়ে সারা রাত তারা খুঁজে বেড়ায় পালিয়ে যাওয়া দুই কিশোরকে। সকাল হতেই পা এর ছাপ ধরে রওনা দেয় গাবুরার মান্নানের নেতৃত্বে একটি দল। দিন শেষে মুখোমুখি হয় তারা। মান্নান এক সময়ের অত্যাচারী দস্যু হিসেবে পরিচিত ছিল। দুর্ধর্ষ এই দস্যু বন বাদায় দিক নির্ণয়ে ভীষণ পারদর্শী ছিল।







এদিকে মান্নান আর আরিফরা মুখোমুখি। বিপদ বুঝতে পেরে প্রথমে মান্নানের ওপর পিস্তল দিয়ে গুলি চালায় বাচ্চু। মুহুর্তেই পাল্টা দো’নলা বন্দুকের গুলি। মাথায় মুখ থুবড়ে পরে বাচ্চুর মৃতদেহ। কাদায় পরে থাকা পিস্তল উঠিয়ে আরিফও গুলি করার চেষ্টা করে। কিন্তু পাশেই বাচ্চুর নিথর দেহ, আর সামনে সাক্ষাত মৃত্যু দেখে থমকে যায় সে। বাহিনী প্রধানের ভাগনে হিসেবে তাকে গুলি করেনি মান্নান। টাকার ব্যাগ আর আরিফকে নিয়ে তারা ফিরে আসে নিজেদের আস্তানায়। আর বাচ্চুর লাশ পরে থাকে সেখানেই।







আরিফকে চার দিন বেঁধে রেখে মারধর করে দলের অন্য সদস্যরা। এ ধরণের অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত মৃত্যু। কিন্তু আত্মীয়তার কারণে আরিফকে হত্যা না করে উঠিয়ে দেয়া হয় লোকালয়ে।







এদিকে গ্রামে ছড়িয়ে গেছে আরিফের গল্প। তাই এলাকায় আর থাকা হয়নি তার। কিছুদিন এখানে সেখানে পালিয়ে থেকে আবার নতুনর করে দস্যু বাহিনীতে যোগ দেয় আরিফ। এভাবেই চলে আরও তিন/চার বছর। অবশেষে মাস্টার বাহিনীর সদস্য ছিল আরিফ। ২০১৬ সালের ৩১ মে, মাস্টার বাহিনীর সঙ্গে আত্মসমর্পন করে আরিফ।







আরিফ এখন সাবেক দস্যু। সরকারের দেয়া অর্থ সাহায্য নিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করার চেষ্টা করছে সে। কিন্তু সেই পথ তার জন্য বেশ বন্ধুর। বনদস্যু মান্নানের গুলিতে পাশের জনের মুখ থুবড়ে পড়া লাশটির কথা সেদিনও বলছিল আরিফ।







আরিফের মত কতজন মৃত্যুকে ছুঁয়ে এসেছে সেই সুন্দরবনে। কত বাচ্চুর লাশের দাফনও হয়নি, তার হিসাব নাই। বাচ্চুর চেহারাটা এখনও স্পষ্ট মনে পড়ে।