প্রতিজ্ঞা করেছিলাম হজ্ব করার পর সিনেমাতে অভিনয় করব না : ডলি জহুর

0
247

প্রতিজ্ঞা করেছিলাম হজ্ব- ঢাকাই ছবির এক অনবদ্য অভিনেত্রীর নাম ডলি জহুর। পর্দায় তাকে সবসময় প্রাণবন্ত হিসেবে পাওয়া যায়। চার যুগেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের এই খ্যাতনামা অভিনেত্রী বিভিন্ন নাটক ও চলচ্চিত্রে তিনি অভিনয় করে দারুণ প্রশংসা কুড়িয়েছেন।
যার সম্মাননা স্বরূপ তিনি টানা তিন বার ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার’ পেয়েছেন, একবার প্রধান অভিনেত্রী হিসেবে এবং দুবার সহ-অভিনেত্রী হিসেবে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই নতুন সিনেমায় দেখা যাচ্ছে না তাকে। মাঝে নতুন কিছু নাটকে দেখা গেলেও সেটাও অপ্রতুল।

২০১২ সালের পর থেকে নতুন কোনো সিনেমায় অভিনয় করছেন না তিনি। এ প্রসঙ্গে ডলি জহুর বলেন, ‘আমি অনেক আগেই চলচ্চিত্রে অভিনয় ছেড়ে দিয়েছি। একটা বিষয় প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যে, হজ করার পর আর ছবিতে অভিনয় করব না। ২০১২ সালে আল্লাহর অশেষ কৃপায় হজ করি। এরপর থেকে আর নতুন ছবিতে অভিনয় করিনি।’

‘প্রতিজ্ঞা করেছিলাম হজ্ব করার পর সিনেমাতে অভিনয় করব না’

ছবিতে না থাকলেও এখন ডলি জহুর অভিনীত বেশ কয়েকটি নাটক-সিরিয়াল প্রচার হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘ক্যাট হাউজ’, ‘মেঘে ঢাকা শহর’ এবং ‘নোয়াশাল’ করছি। আগামীতে নতুন কোনো ছবির অভিনয়ে দেখা যাবে না বলে দৃঢ়তার সঙ্গেই জানালেন এ অভিনেত্রী। তবে নাটকে অভিনয় করতে চেষ্টা করবেন বলে জানিয়েছেন।

আসছে ঈদের জন্য কয়েকটি নাটকে অভিনয়ের জন্য এরইমধ্যে বেশ কয়েকজন নাট্যপরিচালক প্রস্তাব দিয়েছেন। সেখান থেকে সময় সুযোগ করে কিছু কাজ করবেন এ বরেণ্য অভিনেত্রী।

‘প্রতিজ্ঞা করেছিলাম হজ্ব করার পর সিনেমাতে অভিনয় করব না’

উল্লেখ্য, মিডিয়া জগতে ডলি জহুরের পদার্পণ হয় খুব অল্প বয়সে। ভাইয়ের হাত ধরেই তার অভিনয়ে হাতেখড়ি। থিয়েটারে অভিনয় করাকালীন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং সেখানেই পড়াশোনা শেষ করেন।

অভিনয় জীবনে বহু নাটক-টেলিফিল্ম এবং দেড় শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন ডলি জহুর। দর্শকদের কাছে এক মমতাময়ী মা হিসেবে বরাবরই তার উপস্থিতি প্রশংসিত। একজন অভিনেত্রী হিসেবে এটাই জীবনের সবচেয়ে বড় সফলতা হিসেবে বিবেচনা করেন ডলি জহুর।

ডলি জহুর (জন্মঃ ১৯৫৩) বাংলাদেশের কিংবদন্তী অভিনেত্রী। তিনি মঞ্চ, টেলিভিশন এবং চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়ার সময়ে ১৯৭৪-৭৫ সালের দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিনয় শুরু করেন। এরপর মঞ্চে অভিনয় শুরু করেন। পরবর্তীতে টেলিভিশন নাটকে এবং চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু করেন। তিনি ১৬০টির অধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন।

চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি দুইবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। তিনি শঙ্খনীল কারাগার (১৯৯২) চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী এবং ঘানি (২০০৬) চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেত্রী বিভাগে পুরস্কার লাভ করেন।

ডলি জহুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ১৯৭৪-৭৫ সালে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের একটি নাটকে অভিনয় করেন।[৩] এই নাটক থেকে ম. হামিদ বা নাট্যচক্রের একজনের মাধ্যমে নাট্যচক্রে যুক্ত হন এবং মঞ্চে অভিনয় শুরু করেন। নাট্যচক্র থেকে তার অভিনীত প্রথম নাটক লেট দেয়ার বি লাইট। সেখান থেকে তার বন্ধু (পরবর্তীতে স্বামী) জহুরুল ইসলামের সাথে যুক্ত হন কথক নাট্যগোষ্ঠীতে। কথক নাট্যগোষ্ঠী থেকে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত প্রাগৈতিহাসিক অবলম্বনে মঞ্চস্থ নাটকে অভিনয় করেন। নাটকটি কয়েকটি প্রদর্শনীর পর বন্ধ হয়ে যায়।[৪] পরে মামুনুর রশীদের বাংলা থিয়েটারে মানুষ নাটকে অভিনয় করেন। এসময়ে মানুষ নাটকের নিয়মিত কাজের পাশাপাশি নাট্যচক্রের ১০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ম. হামিদ নির্দেশিত অনুস্বারের পালা নাটকে কাজ করেন। মানুষ নাটকের একটি শো করতে তিনি দেশের বাইরেও যান। সেখানে আরণ্যকের ইবলিশ নাটকেরও প্রদর্শনী চলছিল। এই নাটকের অভিনেত্রী নাজমার অনুপস্থিতিতে ডলি এই নাটকেও অভিনয় করেন। পরবর্তীতে দেশে আসার পর আরণ্যকের ময়ূর সিংহাসন নাটকে প্রিন্সেস বলাকার চরিত্রে কাজ করেন এবং আরণ্যকের সাথে যুক্ত হয়ে যান।

তারপর তিনি টেলিভিশন নাটকে কাজ শুরু করেন। টেলিভিশনের জন্য কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ রচিত প্রথম নাটক এইসব দিনরাত্রি (১৯৮৫) এ অভিনয় করেন। নাটকটি পরিচালনা করেন মোস্তাফিজুর রহমান।[৫] বিটিভিতে প্রচারিত এই নাটকে নিলু ভাবী চরিত্রের জন্য তিনি ব্যাপকভাবে পরিচিতি লাভ করেন।[২] পরে এক সাক্ষাৎকারে ডলি বলেন প্রথমে এই নাটকের স্ক্রিপ্ট পড়ে তিনি রেগে গিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি হুমায়ূন আহমেদের একক নাটক জননীতে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন। এই নাটকে তার মেয়ের ভূমিকায় অভিনয় করেন মেহের আফরোজ শাওন।

ডলি জহুর অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্র অসাধারন।[৭] তিনি হুমায়ূন আহমেদ রচিত শঙ্খনীল কারাগার উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত একই নামের চলচ্চিত্র (১৯৯২) এবং হুমায়ূন আহমেদ রচিত ও পরিচালিত আগুনের পরশমণি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। মোস্তাফিজুর রহমান পরিচালিত শঙ্খনীল কারাগার চলচ্চিত্রে রাবেয়া চরিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি প্রথমবারের মত শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন।

২০০৬ সালে তিনি কাজী মোরশেদ রচিত ও পরিচালিত ঘানি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। কলুদের জীবনের নির্মম গল্প নিয়ে নির্মিত ছবিতে রোকেয়া চরিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেত্রীর জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন।[৮] ২০১৫ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৭৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে মাছরাঙ্গা টেলিভিশনে প্রচারিত শেষের রাত্রি টেলিভিশন চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। রবীন্দ্রনাথের একটি ছোটগল্প অবলম্বনে নাটকটি চিত্রনাট্য রচনা করেন এবং পরিচালনা করেন অঞ্জন আইচ।