Thursday , 24 May 2018

সৌদি প্রবাসী তাছলিমার আকুতি, ‘আমার লাশটা দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করেন’!

‘বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরব আসার পর আজ বারো বছর আমি একটি ঘরে বন্দি। এখানে আমাকে প্রতিদিন ৬জন পুরুষের দাসী হয়ে থাকতে হয়। ওরা আমাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করে। বাংলাদেশ সরকারের মাধ্যমে আমার লাশটা দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করেন…’







বাবাকে মুঠোফোনে সুদূর সৌদি আরব থেকে কথাগুলো বলছিলেন সেখানে বিক্রি হয়ে যাওয়া কুমিল্লার নাঙ্গলকোটের তাসলিমা আক্তার (৩৫)। সে ওই উপজেলার মক্রমপুর গ্রামের সামসুল হকের মেয়ে।







পাশের লাকসাম উপজেলার শ্রীয়াং গ্রামের আলম হোসাইন আলম ২০০৭ সালে তাকে সৌদি আরব নিয়ে ৫ লাখ টাকায় বিক্রি করে দেয় বলে অভিযোগ তাসলিমার বাবা ও স্বজনদের। এ ঘটনায় গত বৃহস্পতিবার বিকেলে সামছুল হক বাদী হয়ে মানব পাচারকারী আলমসহ ৩ ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করে নাঙ্গলকোট থানায় একটি সাধারণ ডায়েরী করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন প্রতারক আলম তাসলিমার ১২ বছরের বেতন বাবদ ৩১ লাখ ৬৮ হাজার টাকাও আত্মসাত করেছেন।







তাছলিমার পরিবার ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, আলম হোসাইন ২০০৭ সালে নাঙ্গলকোট উপজেলার মক্রমপুর উত্তরপাড়ার সামছুল হকের মেয়ে তাসলিমা আক্তার (৩৫), একই উপজেলার হাপানিয়া গ্রামের সুরুজ খাঁনের ভাগিনা সবুজ খাঁন (৩২) ও ভবানীপুর গ্রামের আলী মিয়ার মেয়ে আমেনা আক্তারকে (৩০) সৌদি আরবে কাজে পাঠানোর কথা বলে প্রত্যেকের কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা করে নেয়।







তবে তাসলিমা ছাড়া বাকি দু’জনকে সৌদি আরব নেয়ার ব্যবস্থা করতে পারেনি আলম। পরবর্তীতে ওই বছরের ৮ জুন তাসলিমাকে সৌদি আরব নিয়ে কয়েক দিন তার বাসায় রাখার পর তাঁর যাবতীয় কাগজপত্র রেখে সৌদি এক নাগরিকের কাছে বিক্রি করে দেয় আলম। এরপর থেকে সৌদির ওই ব্যক্তির আটকে রাখা একটি ঘরে নিয়মিত ৬ ব্যক্তির কৃতদাস হয়ে থাকতে হচ্ছে তাছলিমাকে।







ওই ছয় ব্যক্তি তাকে নিয়মিত দাসীর ন্যায় শারিরিক ও মানুষিক ভাবে নির্যাতন চালায়। বিনিময়ে খাবার ছাড়া অন্য কিছুই জুটেনা এ হতভাগীর কপালে। বন্ধ হয়ে করে হয় যাবতীয় যোগাযোগ। দেয়া হয় না তাকে কোন বেতন। প্রতারক আলম যে সৌদি ব্যক্তির ভিসার মাধ্যমে তাকে কাজের মেয়ে হিসাবে নেয়, তার কাছ থেকে প্রতিমাসে ২২ হাজার (২হাজার রিয়াল) টাকা নিজ ব্যাংক হিসাবে জমা করে।







এদিকে, দীর্ঘ ১২ বছর যাবত ওই নারীকে নির্যাতনের সংবাদ পেয়ে ভিসা প্রদানকারী সৌদি ব্যক্তি প্রতারক আলমের বিরুদ্ধে সৌদি আইন অনুসারে মানব পাচার ও বেতনের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে শ্রম মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে মামলা করেন। মামলার পর আলম সৌদি আরব থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে এসে আত্মগোপনে থাকেন।







অপরদিকে, গেলো সপ্তাহে সৌদি আরব থেকে তাসলিমা অজ্ঞাত এক মোবাইল নাম্বার থেকে তার পিতা সামসুল হকের কাছে ফোন করে তাকে পাচার ও বিক্রি করে দেয়ার বিষয়টি জানান। সেই সাথে জীবিত অথবা মৃত- যেভাবেই হোক তাকে যেনো দেশে আনার ব্যবস্থা করে সে অনুরোধ জানান।







কিন্তু সৌদিতে বর্তমানে তার অবস্থান কোথায়- সে বিষয়ে কিছুই জানাতে পারেনি তাসলিমা। আর অজ্ঞাত স্থানে থাকার কারণে তার পরিবারের মাঝে হতাশা দেখা দিয়েছে।







রোববার দুপুরে তাসলিমার পিতার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, দীর্ঘ বারো বছর পর কয়েকদিন আগে আমার মেয়ের সাথে কথা হয়। সে সৌদিতে অনেক কষ্টে আছে, তাকে আমি ফিরত চাই।







আত্মগোপনে থাকা আলমের বড় ভাই ইদ্রিছ মিয়া বলেন, আমার ছোট ভাইয়ের বিষয়টি আমি জানি না, তবে সে এমন কাজ করবে বলে আমার মনে হয় না।







নাঙ্গলকোট থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আশ্রাফুল ইসলাম বলেন, তাছলিমার পিতার আবেদন অনুযায়ী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরী করা হয়েছে। তদন্ত স্বাপেক্ষে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে মেয়েটিকে উদ্ধার এবং মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।