Tuesday , 22 May 2018

রাজীবের খালার অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন: অনন্ত জলিল

রাজধানীতে বাসচাপায় হাত হারানোর পর প্রাণ হারানো কলেজ ছাত্র রাজীব হোসেনের দুই ভাইয়ের দায়িত্ব নেয়ার ঘোষণা দেয়ার পর ‘প্রত্যাশিত সহায়তা মেলেনি’ বলে যে অভিযোগ উঠেছে সেটি মিথ্যাচার বলে দাবি করেছেন চিত্রনায়ক, প্রযোজক ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী অনন্ত জলিল।







সোমবার সকালে তিনি বলেন, বিষয়টি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। রাজীবের দুই ভাইয়ের থাকা, খাওয়া, শিক্ষা, চিকিৎসা, বস্ত্রসহ জীবন ধারণের জন্য যাবতীয় ব্যয় আমি বহন করবো সেটা নিশ্চিত করেছি।







গত ৩ এপ্রিল রাজধানীতে দুই বাসের চাপায় হাত হারনো রাজীব ১৬ এপ্রিল মধ্যরাতে মারা যাওয়ার পরই তার পরিবারের করুণ পরিস্থিতির কথা জানা যায়। এই তরুণের বাবা মা পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন আগেই। আর দুটি ভাইয়ের দায়িত্ব ছিল রাজীবের ওপর।







রাজীবের মৃত্যুর পর তার দুই ভাই ১৪ বছর বয়সী আবদুল্লাহ হৃদয় এবং ১৫ বছর বয়সী মেহেদী হাসান বাপ্পীকে নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ হলে অনন্ত জলিল ফেসবুকে দুই কিশোরের দায়িত্ব নেয়ার আগ্রহের কথা জানান।







পরে গত ২২ এপ্রিল তার নিজস্ব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এজেআই গ্রুপের কার্যালয়ে রাজীবের খালা জাহানারা বেগম এবং মামা জাহিদুল ইসলামের উপস্থিতিতে তার ছোট দুই ভাই মেহেদি ও আবদুল্লাহকে ডেকে নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এ দায়িত্ব নেন তিনি।







সম্প্রতি কয়েকটি গণমাধ্যমে রাজীবের খালার বরাত দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে- অনন্তর কাছ থেকে রাজীবের ছোট দুই ভাইয়ের জন্য প্রত্যাশিত সাহায্য মেলেনি।







রাজীবের খালা বলেন, ‘অনন্ত জলিল দুজনের দায়িত্ব নিলেও তিনি কীভাবে নেবেন সে বিষয়ে কিছুই বলেননি। শুধু বলেছেন দায়িত্ব নেবেন। পরে আমি অনন্ত জলিলের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি আমাদের তার বাসায় নিয়ে ১০ হাজার টাকা দিয়ে বিদায় করেছেন।







এ বিষয়ে অনন্ত জলিলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে এগুলো মিথ্যাচার বলে দাবি করেছেন চিত্রনায়ক অনন্ত জলিল। তিনি সোমবার সকালে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘রাজীবের দুই ভাইয়ের দায়িত্ব নেয়াটাই মুখ্য বিষয়। তাদের থাকা, খাওয়া, শিক্ষা, চিকিৎসা, বস্ত্রসহ জীবন ধারণের জন্য যাবতীয় ব্যয় আমি বহন করবো সেটা নিশ্চিত করেছি ওদের দুই ভাইকে। আমি ওদের পাশে দাঁড়াতে চাই বলেই নিজের লোক দিয়ে রাজীবের ছোট দুই ভাই ও খালা এবং মামাকে খুঁজে বের করে আমার অফিসে নিয়ে এসেছি।







তিনি বলেন, আমি পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারি, রাজীবের মৃত্যুর পর ওর ছোট দুই ভাইয়ের আর কেউ নেই। তাই তাদের দায়িত্ব নিতে চেয়েছি। এজন্য আমি আমার ফ্যাক্টরির কাছাকাছি একটি ভালো মাদ্রাসায় তাদের ভর্তির জন্য কথাও বলেছি। তাদের থাকার জায়গার ব্যবস্থা করেছি। তারা যেন আমার সঙ্গে প্রতি সপ্তাহে একবার দেখা করতে পারে সেই কথাও বলেছি।’







তিনি আরও বলেন, ‘কিন্তু যখন ওরা দুই ভাই আমার অফিসে এলো, আমি দেখলাম ওদের সঙ্গে আপন মামা খালা রয়েছেন। তারা ছেলে দুটোকে বর্তমানে যেখানে আছে সেখানে রেখেই পড়াশোনা করাতে চান। তাই আমিও ভাবলাম, আপন কোনো মানুষের কাছাকাছি থাকলে তারাও হয়তো ভালো থাকবে। মানসিকভাবে শান্তি পাবে। তাই তাদের শর্ত মেনে যেখানে আছে সেখানেই পড়াশোনা ও ভরনপোষনের দায়িত্ব নিলাম। সেইসঙ্গে জানিয়ে দিলাম তাদের কিছু খেতে ইচ্ছে হলে, কিছু পরতে ইচ্ছে হলে আমাকে জানাতে পারবে। আমি সেই ব্যবস্থা করবো।







তাদের সবকিছু দেখভালের জন্য আমার অফিসের কর্মকর্তা মুফতি রুহুল আমিনকে দায়িত্বও দিয়েছি। মুফতি সাহেবকে মাদ্রাসায় গিয়ে তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য নিয়ে সব দায়িত্ব মাদ্রাসার প্রিন্সিপালকে বুঝিয়ে দিতে বলেছি। আমার লোকজন সেটা করেছেও। তবে ওদের খালা কেন বলছেন যে প্রত্যাশিত সাহায্য মেলেনি? উনারা আসলে একসঙ্গে অনেক টাকা পাবেন সেটাই হয়তো প্রত্যাশা করেছিলেন।







কিন্তু এখানে নগদ টাকার প্রশ্ন আসবে কেন? রাজীব দুর্ভাগ্যের শিকার। ওর দুটি ভাইকে আমি নিজের ভাই মনে করে ওদের দায়িত্ব নিয়েছি। তাদের এককালীন টাকা দিয়ে কেন বিদায় করে দিতে হবে? আমি তাদের দায়িত্ব পালন করবো। ওদের শিক্ষা শেষ হলে চাকরির ব্যবস্থাও হতে পারে। কেন আজেবাজে মিথ্যে ছড়ানো হচ্ছে?’







অনন্ত বলেন, ‘ওইদিন আমার অফিস থেকে বের হওয়ার সময় আমি ছেলে দুটির জন্য কিছু কিনে দিতে ১০ হাজার টাকা দিয়েছি। এর বেশি কিছু নয়। সেদিন আলোচনা চলাকালীন রাজীবের খালা আমাকে বলেছিল ছেলে দুটিকে তাদের তত্বাবধানে আলাদা বাসায় রাখতে চান। কিন্তু তাতে আমি রাজি হইনি। কারণ ওরা আগে থেকেই মাদ্রাসার হোস্টেলে থাকতো। হোস্টেলে ছাত্রদের পড়াশোনার বিষয়ে শিক্ষকরা নিয়মিত খোঁজ-খবর নেন। সেখানে থাকলে লেখাপড়াও ভালো হবে। তাই বাসার রাখার পক্ষে আমি ছিলাম না। উনারা এতোই যদি আন্তরিক হতেন দুই ভাইয়ের প্রতি তবে রাজীব বেঁচে থাকতে কেন ওদেরকে এতিমখানায় দিয়েছিলো?







আমি খোঁজ নিয়ে জেনিছ, ওই দুই ভাই মূলত যাত্রাবাড়ীতে অবস্থিত তামিরুল মিল্লাত মাদ্রাসায় এতিম কোটায় পড়াশোনা করছিলো। তাদের খুব বেশি খরচ লাগে না। এরপর আমার অনুরোধেই তাদেরকে এতিম কোটা থেকে সাধারণ কোটায় নিয়ে আসেন প্রিন্সিপাল। সাধারন কোটায় থেকে পড়াশোনার জন্য মাসিক যে খরচ লাগবে সেটা পরিশোধও করেছি আমি এরইমধ্যে। এভাবে প্রতিমাসে তাদের পড়াশোনা ও ভরন পোষনের সব খরচ অফিসিয়ালি প্রিন্সিপালের কাছে পাঠিয়ে দেয়া হবে আমার পক্ষ থেকে। কিন্তু ওদের দুই ভাইয়ের খালা কিংবা মামাদের কোনো টাকা পয়সা দেব সেটা আমি কখনো বলিনি, আর সেটার প্রয়োজনও দেখছি না। কথা অনুযায়ি দায়িত্ব নিয়েছি।’







অনন্ত আরও জানান, ‘ওদের খালা ও মামা ছেলে দুটোর অসহায়ত্ব ও দুর্ভাগ্য নিয়ে খেলছেন। আমার দায়িত্ব নেয়ার পরও শুনেছি ছেলে দুটিকে নিয়ে তার খালা এবং মামা আরও অন্যান্য জায়গায় যাচ্ছেন সাহায্যের জন্য। তাতেও আমি নিষেধ করিনি। বরং এটাও বলেছি, আমি তো সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিলাম, তারপরও যদি কেউ তাদের নগদ সাহায্য করতে চায় তাহলে দুই ছেলের নামে দুটো ব্যাংক একাউন্ট করে সেখানে জমা করে রাখতে। ভবিষ্যতে তাদের কাজে লাগবে। এসব কিছুর পরও তারা কেন অভিযোগ করছে সেটা বোধগম্য নয়।’







অনন্ত বলেন, ‘আমি ওদের দায়িত্ব নিয়েছি এবং সেটা পালন করে যাবো। আমার লোক তাদের প্রয়োজন ও চাহিদার তদারকি করবে। ওদের যা কিছু প্রয়োজন হয় সেটা মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল সাহেবকে জানালেই পেয়ে যাবে।’







উল্লেখ্য, গত ৩ এপ্রিল কারওয়ানবাজারে এলাকায় বিআরটিসির বাসের যাত্রী সরকারি তিতুমীর কলেজের স্নাতক তৃতীয় বর্ষের ছাত্র রাজীব হোসেনের ডান হাত অন্য একটি বাসের মাঝখানে চাপা পড়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।







পথচারীরা তাঁকে রাজধানীর একটি হাসপাতালে ভর্তি করান। সেখান থেকে তাঁকে ঢামেকে স্থানান্তর করা হয়। রাজীবের মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ শুরু হলে তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। ১৬ এপ্রিল মধ্যরাতে চিকিৎসকরা রাজীবের লাইফ সাপোর্ট খুলে দিয়ে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। রাজিবের বাড়ি পটুয়াখালী জেলার বাউফল উপজেলায়।







২০০৭ সালে রাজীবের বাবা মারা যাওয়ার পর তিনি তার দুই ভাইয়ের অভিভাবক ছিলেন। রাজীব তার মাকে হারান যখন তাঁর বয়স ছিল আট বছর এবং তার ছোট ভাইয়ের বয়স ছিল ১০ মাস। এরপর থেকে আত্মীয়-স্বজনরা তাদের দেখভাল করতেন।